ভোলার দারুল হাদিস কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস ও উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আমিনুল হক নোমানীকে হত্যার অভিযোগে তার ১৭বছর বয়সী বড় ছেলে রেদোয়ানুল হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বাবার অতিরিক্ত ও কঠোর শাসনের প্রতি তীব্র ক্ষোভএবং তা থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে জানিয়েছে পুলিশ। সিনেমার বিভিন্ন দৃশ্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়, যার জন্য অনলাইন শপ ‘দারাজ’ থেকে একটি ধারালো ছুরিও কেনা হয়েছিল। শনিবার (১৩ই সেপ্টেম্বর) বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন।
পুলিশ সুপার জানান, নিহত আমিনুল হকের কড়া শাসনে রেদোয়ানের মনে তীব্র ক্ষোভ জন্মায় এবং এক পর্যায়ে তার মধ্যে মানসিক বিকৃতিও দেখা দেয়। মুক্তির পথ খুঁজতে গিয়ে সে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। কিছুদিন আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং প্রায় দুই মাস আগে
আত্মহত্যার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এরপর পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে তজুমদ্দিনের খাসের হাটে তার মামার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেখানে থেকেও তার ক্ষোভ কমেনি। মামা বাড়িতে থাকাকালীন সে বিভিন্ন সিনেমা দেখে বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে।রিকল্পনার অংশ হিসেবে গত ২রা সেপ্টেম্বর ‘দারাজ’ অ্যাপের মাধ্যমে একটি ধারালো ছুরির অর্ডার দেয় রেদোয়ান, যা তার হাতে এসে পৌঁছায় ৫ই সেপ্টেম্বর। এরপর হত্যার মিশন বাস্তবায়নের জন্য সিনেমার খলনায়কদের অনুকরণে সে মামার বাড়ি থেকে একটি কালো শার্ট ও ঘড়ি এবং ভোলা শহর থেকে একটি ক্যাপ সংগ্রহ করে ছদ্মবেশ ধারণের প্রস্তুতি নেয়।
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৬ই সেপ্টেম্বর রেদোয়ান তজুমদ্দিন থেকে ভোলায় নিজেদের বাড়িতে আসে। ওই দিন এশার নামাজের পর রাত আনুমানিক ৯টার দিকে ঘরে ফেরা মাত্রই সে তার বাবা আমিনুল হকের পেটে ছুরি চালায়। প্রথম আঘাতেই মাওলানা আমিনুল হক ছুরিটি ধরে ফেলেন এবং ছেলের কাছে মাফ চেয়ে নিজের জীবন ভিক্ষা চান। কিন্তু বাবার করুণ আর্তনাদও রেদোয়ানের মন গলাতে পারেনি। সিনেমা থেকে শেখা কৌশলে সে বাবার বুকে, পেটে এবং ঘাড়ের পেছনে উপর্যুপরি আঘাত করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এসময় আমিনুল হকের ‘বাঁচাও বাঁচাও’ চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে রেদোয়ান ঘরের পেছন দিয়ে পালিয়ে যায়।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, পালানোর সময় সে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিটি বাড়ির পেছনের খালে ফেলে দেয়। এরপর কালো শার্ট ও ক্যাপ পরিহিত ছদ্মবেশী রেদোয়ান রক্তমাখা জামা নিয়েই বাড়ির সামনের রাস্তা থেকে একটি অটোরিকশায় করে ভোলা শহরে আসে। শহরের খলিফাপট্টি জামে মসজিদে ঢুকে সে নিজের শরীর ও পোশাক থেকে রক্তের দাগ পরিষ্কার করে। এরপর শহর থেকে একটি সিএনজি অটোরিকশায় করে তুজুমদ্দিনে তার
মামার বাড়িতে ফিরে যায়, যেন কিছুই ঘটেনি। এদিকে, গুরুতর আহত আমিনুল হককে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দিকটি উন্মোচিত হয় পরদিন, ৭ই সেপ্টেম্বর। ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত নিহত আমিনুল হকের জানাজায় তার বড় ছেলে রেদোয়ানুল হক নিজেই বক্তব্য রাখে। বক্তব্যে সে তার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করে জোরালো আওয়াজ তোলে। যদিও তার চোখেমুখে কোনো আবেগ বা শোকের চিহ্ন ছিল না, যা অনেকের মনে সন্দেহের জন্ম দেয়।